নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করলে মানবদেহের পেশি, হৃদযন্ত্র ও বিপাকপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে মেদ জমা, অলসতা এবং দীর্ঘমেয়াদে নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক জটিলতার ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে।
ব্যায়াম না করলে শরীরে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে
আমাদের মানবদেহ সক্রিয় থাকার জন্যই তৈরি। দীর্ঘ দিন কায়িক পরিশ্রমহীন বা অলস জীবনযাপন করলে শরীরে সাধারণত নিম্নলিখিত প্রভাবগুলো দেখা দিতে পারে:
- পেশির দুর্বলতা ও শক্তি হ্রাস: নিয়মিত পেশির ব্যবহার না হলে তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পেশির ভর কমতে থাকে।
- বিপাকপ্রক্রিয়া ধীর হওয়া ও ওজন বৃদ্ধি: দৈনন্দিন খাবার থেকে প্রাপ্ত ক্যালরি শরীরচর্চার মাধ্যমে খরচ না হলে তা শরীরে মেদ হিসেবে জমা হতে পারে। এর ফলে শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাকপ্রক্রিয়ার গতি কমে যায়।
- হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতায় প্রভাব: শারীরিকভাবে সক্রিয় না থাকলে রক্ত সঞ্চালনের গতি কিছুটা কমে যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্র ও ধমনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
- হাড়ের ঘনত্ব ও জয়েন্টের স্থায়িত্ব কমা: পর্যাপ্ত হাঁটাচলা বা কায়িক পরিশ্রম না করলে হাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং জয়েন্টে শক্তভাব বা ব্যথার অনুভুতি বাড়তে পারে।
- মানসিক ক্লান্তি ও অবসাদ: ব্যায়ামের সময় মস্তিষ্কে কিছু ভালো লাগার হরমোন নি নিঃসৃত হয়। ব্যায়াম না করলে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তি বোধ কিছুটা বেশি হতে পারে।
নিয়মিত সক্রিয় থাকার সুফল ও সহজ কিছু অভ্যাস
শরীরের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে প্রতিদিন খুব কঠিন ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই, পরিমিত সক্রিয়তাই যথেষ্ট। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার সুফলগুলো হলো:
- রক্তে শর্করা ও চাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা: কায়িক পরিশ্রম শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরোক্ষভাবে সাহায্য করে।
- উন্নত ঘুম ও হজমপ্রক্রিয়া: হালকা ব্যায়ামের ফলে পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় থাকে এবং রাতে ভালো ঘুম হতে সাহায্য করে।
- সহজ চর্চা: প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা বাসায় হালকা ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী।
কাদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন?
সবার শারীরিক অবস্থা এক রকম নয়, তাই ব্যায়াম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত:
- হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী: হুট করে কোনো ভারী ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হালকা হাঁটা বা স্ট্রেচিং বেছে নেওয়াই নিরাপদ।
- গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থায় হালকা হাঁটা নিরাপদ হলেও যেকোনো নতুন শারীরিক কসরত শুরু করার আগে গাইনি বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া জরুরি।
- ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগী: রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়া বা ক্লান্তি এড়াতে সময় ও মাত্রার সঠিক সামঞ্জস্য রেখে হালকা ব্যায়াম করা ভালো।
- জয়েন্টের সমস্যা বা প্রবীণ ব্যক্তি: যাদের হাঁটু বা কোমর ব্যথা রয়েছে, তাদের লাফানো বা অতিরিক্ত ওজন তোলার ব্যায়াম পরিহার করে হাঁটা ও ফিজিওথেরাপিস্টের শেখানো ব্যায়াম করা উচিত।
ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রম নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
- ভুল ধারণা ১: গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজই ব্যায়ামের বিকল্প।
সত্যতা: গৃহস্থালির কাজ শরীরকে সচল রাখলেও তা হৃদস্পন্দন ও পেশির সঠিক কার্যক্ষমতা বাড়াতে সবসময় সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখে না। আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট সময় ধরে হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রম প্রয়োজন। - ভুল ধারণা ২: জিমে না গেলে বা ভারী ওজন না তুললে ব্যায়াম হয় না।
সত্যতা: জিমে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাসায় উন্মুক্ত স্থানে প্রতিদিন নিয়মিত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা অ্যারোবিক ব্যায়াম সুস্থ থাকতে চমৎকার কাজ করে।
সাধারণ প্রশ্ন
১. দিনে কতটুকু সময় ব্যায়াম করা উচিত?
সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সুস্থতার জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম (যেমন দ্রুত হাঁটা) বা দিনে প্রায় ২০-৩০ মিনিট সক্রিয় থাকা যথেষ্ট মনে করা হয়।
২. ব্যায়াম না করলে কি সরাসরি কোনো রোগ হয়?
না, কায়িক পরিশ্রম না করলেই যে হঠাৎ কোনো রোগ হয়ে যাবে তা নয়; তবে এটি অলক্ষ্যে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং ওজন বৃদ্ধি ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি কিছুটা বাড়ায়।
৩. ব্যায়াম শুরু করার পর শরীর ব্যথা করলে কী করা উচিত?
নতুন ব্যায়াম শুরু করলে প্রথম কয়েক দিন পেশিতে হালকা ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক। তবে খুব বেশি অস্বস্তি হলে কয়েক দিন ব্যায়ামের মাত্রা কমিয়ে বিশ্রাম নেওয়া ভালো।
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও সতেজ থাকার অন্যতম সহজ উপায়। তবে আপনার যদি আগে থেকেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা বা জটিলতা থাকে, তবে নতুন কোনো ব্যায়াম রুটিন শুরু করার আগে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিন।
কভার ছবি: Gabin Vallet / Unsplash
