ফিলিপে কুতিনহো ব্রাজিলের একজন সৃষ্টিশীল আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার, যিনি শৈল্পিক ড্রিবলিং এবং বক্সের বাইরে থেকে বাঁকানো শটে গোল করার দক্ষতার জন্য বিশ্ব ফুটবলে সমাদৃত। ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে দুর্দান্ত সময় কাটিয়ে বার্সেলোনায় রেকর্ড অঙ্কের ফিতে পাড়ি জমানোর পর তাঁর ক্যারিয়ারে বেশ কিছু চড়াই-উতরাই দেখা গেছে।
শৈশব থেকে ইউরোপের মঞ্চে আগমন
ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে জন্ম নেওয়া কুতিনহো শৈশবেই ফুটবলের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। স্থানীয় ক্লাব ভাস্কো দা গামার যুব দলে তাঁর ফুটবলের হাতেখড়ি হয়। দ্রুতই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি নজরে আসেন ইউরোপীয় স্কাউটদের।
খুব কম বয়সে ইতালিয়ান জায়ান্ট ইন্টার মিলান তাঁর সঙ্গে চুক্তি সারে। সেখানে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ের মাঝে স্প্যানিশ ক্লাব এস্পানিওলেও ধারে খেলেন তিনি। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয় ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্তটি।
লিভারপুলের সোনালী অধ্যায় ও ‘ম্যাজিশিয়ান’ খ্যাতি
২০১৩ সালে লিভারপুলে যোগ দেওয়ার পর কুতিনহো বিশ্বমানের মিডফিল্ডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অ্যানফিল্ডে তাঁর বল নিয়ন্ত্রণ, মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়ার দূরদর্শিতা এবং দূরপাল্লার শট দর্শকদের মুগ্ধ করত। ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিতি পান ‘লিটল ম্যাজিশিয়ান’ নামে।
- ম্যাচ নির্ধারণী ভূমিকা: লিভারপুলের জার্সিতে প্রিমিয়ার লিগ ও ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন তিনি।
- আক্রমণভাগের মূল চালিকাশক্তি: তৎকালীন কোচদের অধীনে দলের মূল প্লেমেকার হিসেবে আক্রমণ তৈরির পুরো দায়িত্ব ছিল তাঁর কাঁধে।
বার্সেলোনায় রেকর্ড ট্রান্সফার ও প্রত্যাশার চাপ
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ইতিহাসের অন্যতম শীর্ষ ট্রান্সফার ফিতে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায় যোগ দেন কুতিনহো। ক্যাম্প ন্যুতে তাঁকে দেখা হচ্ছিল ক্লাবের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। শুরুটা আশাব্যঞ্জক হলেও ধীরে ধীরে নানা কারণে তাঁর ফর্ম ওঠানামা করতে থাকে।
দলের নির্দিষ্ট কৌশলের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, অবস্থানের পরিবর্তন এবং ধারাবাহিক ইনজুরি তাঁর আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। বার্সেলোনায় থাকা অবস্থায় তিনি জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখে ধারে খেলেন। বায়ার্নের জার্সিতে তিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ট্রেবল জয়ের স্বাদ পান, যেখানে বার্সেলোনার বিপক্ষেই একটি স্মরণীয় ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করেন।
ইনজুরি ও পরবর্তী ক্যারিয়ার
স্পেনে ফেরার পর ইনজুরির কারণে কুতিনহো তাঁর স্বভাবসুলভ ধার কিছুটা হারান। পরবর্তীতে তিনি পুনরায় প্রিমিয়ার লিগে ফেরেন অ্যাস্টন ভিলার হয়ে, যেখানে তাঁর সাবেক সতীর্থ স্টিভেন জেরার্ড তখন কোচ ছিলেন। সেখানে কিছুদিন ভালো ঝলক দেখালেও ধারাবাহিকতার ঘাটতি রয়ে যায়।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যের ক্লাব আল-দুহাইলেও ধারে খেলেছেন তিনি। ক্যারিয়ারের পরিণত বয়সে তিনি নিজের শিকড় ভাস্কো দা গামায় ফিরে আসার উদ্যোগ নেন, যাতে চেনা পরিবেশে আবারও ফুটবলের আনন্দ ফিরে পাওয়া যায়।
খেলার ধরন ও কৌশলগত বৈশিষ্ট্য
ফিলিপে কুতিনহো মূলত একজন ক্লাসিক ‘নাম্বার টেন’ বা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার, তবে বাম প্রান্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে খেলা উইঙ্গার হিসেবেও তিনি দারুণ সফল।
- সিগনেচার শট: বক্সের বাম দিক থেকে ভেতরের দিকে এসে ডান পায়ের বাঁকানো শটে দূরের পোস্টে গোল করা তাঁর ট্রেডমার্ক।
- ড্রিবলিং ও ভিশন: ছোট জায়গায় বলের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণ রেখে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করার পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরিতে তিনি সিদ্ধহস্ত।
সাধারণ প্রশ্ন
ফিলিপে কুতিনহো বর্তমানে কোন পর্যায়ে খেলছেন?
ক্যারিয়ারের ইউরোপীয় শীর্ষ পর্বের পর কুতিনহো বিভিন্ন ক্লাবে ধারে খেলেছেন এবং পরবর্তীতে নিজের পুরনো ক্লাব ভাস্কো দা গামায় যোগ দিয়ে নিয়মিত খেলার চেষ্টা করছেন।
জাতীয় দলের হয়ে কুতিনহোর সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?
তিনি ২০১৮ ফিফা বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা পারফর্মার ছিলেন এবং ২০১৯ সালে ব্রাজিলের কোপা আমেরিকা শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বার্সেলোনায় তাঁর ব্যর্থতার মূল কারণ কী ছিল?
খেলার পজিশন নিয়ে অসঙ্গতি, অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ এবং একের পর এক শারীরিক ইনজুরি তাঁকে বার্সেলোনায় স্থায়ীভাবে সফল হতে দেয়নি।
আধুনিক ফুটবলে প্রতিভার পাশাপাশি দলের কৌশল এবং চোটমুক্ত থাকা কতটা জরুরি, ফিলিপে কুতিনহোর ক্যারিয়ার তার অন্যতম বড় উদাহরণ। শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে তাঁর সব প্রত্যাশা হয়তো পুরোপুরি পূরণ হয়নি, তবুও লিভারপুল ও ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর জাদুকরী মুহূর্তগুলো ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কভার ছবি: Geoff Charles / Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0

