ইসলামী শরিয়তে দাম্পত্য জীবনকে পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই নির্দিষ্ট কিছু অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। একজন অপরজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করলে পরিবারে যেমন শান্তি নেমে আসে, তেমনি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও অর্জিত হয়।
স্ত্রীর ওপর স্বামীর দায়িত্ব ও অধিকারসমূহ
ইসলামী জীবনবিধানে পরিবারের পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার দায়িত্ব প্রধানত স্বামীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। একজন আদর্শ মুসলিম স্বামী তাঁর স্ত্রীর দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার দিকে খেয়াল রাখবেন। স্ত্রীদের প্রতি স্বামীর মূল দায়িত্ব ও অধিকারগুলো নিম্নরূপ:
- মোহরানা আদায় করা: বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর স্ত্রীর নির্ধারিত মোহরানা সানন্দে ও সসম্মানে আদায় করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তব্য।
- খোরপোশ ও বাসস্থান: নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা এবং একটি নিরাপদ ও স্বাধীন বাসস্থানের সংস্থান করা।
- সদাচরণ ও নমনীয়তা: স্ত্রীর সঙ্গে সর্বাবস্থায় উত্তম, দয়ালু ও নমনীয় ব্যবহার করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করার জন্য।
- দ্বীনি শিক্ষায় সহযোগিতা: স্ত্রীকে সঠিক দ্বীনি শিক্ষা অর্জন এবং আমল করার সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।
স্বামীর ওপর স্ত্রীর দায়িত্ব ও অধিকারসমূহ
একটি সুখী পরিবার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্ত্রীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘরোয়া পরিবেশ শান্তিময় রাখা এবং স্বামীর বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা স্ত্রীর অন্যতম মূল দায়িত্ব। নিচে স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য ও অধিকারগুলো উল্লেখ করা হলো:
- শ্রদ্ধা ও বিশ্বস্ততা: শরিয়তের সীমার মধ্যে থেকে স্বামীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে নিজের হিজাব, আমানত ও স্বামীর সম্পদের সুরক্ষা প্রদান করা।
- সংসারের সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা: সাধ্য অনুযায়ী ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে আনন্দময় ও সুসংহত রাখা, যাতে কর্মক্ষেত্র থেকে ফিরে স্বামী মানসিকভাবে প্রশান্তি পান।
- ভালোবাসা ও সহানুভূতি: স্বামীর সুখে-দুঃখে পাশে থাকা, তাঁর কষ্টের দিনে সান্ত্বনা দেওয়া এবং ভালো কাজে তাঁকে উৎসাহিত করা।
- পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করা: স্বামীর আত্মীয়স্বজন ও পিতামাতাকে যথাসম্ভব সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখা।
দাম্পত্য জীবনে সুন্নতি ভালোবাসার গুরুত্ব
আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত প্রেমময়, বন্ধুসুলভ ও সম্মানজনক আচরণ করতেন। তিনি ঘরে রাসুল হিসেবে নয়, বরং একজন আদর্শ গৃহকর্তা হিসেবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। সহিহ বুখারির বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, মহানবী (সা.) ঘরের ছোটখাটো কাজেও স্ত্রীদের হাত বাড়াতেন।
পবিত্র কুরআনের সূরা আর-রুমে আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আমাদের মধ্য থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাই এবং আমাদের মাঝে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। তাই দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও ক্ষমাশীলতা। সামান্য ভুলত্রুটি বড় করে না দেখে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
পারিবারিক ভুলবোঝাবুঝি ও সমাধানের উপায়
যেহেতু মানুষ মাত্রই ভুলত্রুটি হতে পারে, তাই দাম্পত্য জীবনে টুকটাক অমিল বা মতবিরোধ হওয়া স্বাভাবিক। তবে তা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সমস্যা দেখা দিলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মেনে চলা যেতে পারে:
- ধৈর্য ও সহনশীলতা: রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং একজন রাগান্বিত হলে অন্যজনের নীরব ভূমিকা পালন করা।
- খোলামেলা আলোচনা: তৃতীয় কোনো ব্যক্তিকে মাঝখানে না এনে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে শান্তভাবে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধান করা।
- পরামর্শের সুন্নাহ: ঘরের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করা একটি চমৎকার সুন্নতি আমল।
- আলেমদের দিকনির্দেশনা নেওয়া: যদি সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে, তবে কোনো অভিজ্ঞ ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
একটি সুন্দর ইসলামিক পরিবার গড়ার ব্যবহারিক পদক্ষেপ
একটি পরিবারকে আদর্শ ইসলামিক পরিবার হিসেবে গড়ে তুলতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। প্রতিদিনের জীবনে কিছু ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করলে সংসারে সুবাতাস বইতে শুরু করে।
প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় পরিবারের সবাই মিলে ঘরে তালীম করা, একসঙ্গে সালাত আদায়ের চেষ্টা করা এবং পরস্পরের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এছাড়া, একে অপরের অবদানকে ছোট করে না দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। স্বামী যখন স্ত্রীর গৃহস্থালি কাজের প্রশংসা করেন এবং স্ত্রী যখন স্বামীর উপার্জনের কষ্টকে সম্মান জানান, তখন ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
ইসলামে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে কার দায়িত্ব বেশি?
ইসলামে দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা হয়েছে; কারও দায়িত্ব কম বা বেশি নয়, বরং তা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রের। স্বামী মূলত উপার্জনের ও সুরক্ষার দায়িত্বে থাকেন, আর স্ত্রী সংসারের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সন্তান প্রতিপালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্ত্রীর পরামর্শ নেওয়া কি জরুরি?
হ্যাঁ, পারিবারিক বিষয়ে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ ও সুন্নাহ। পরামর্শের মাধ্যমে কাজ করলে দাম্পত্য সম্পর্কে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বরকত বৃদ্ধি পায়।
কোনো বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কঠিন মতবিরোধ হলে করণীয় কি?
যেকোনো মতবিরোধ ধৈর্য ও ঠাণ্ডা মাথায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উত্তম। ব্যক্তিগতভাবে সমাধান সম্ভব না হলে পরিবারের অভিজ্ঞ অভিভাবক বা কোনো যোগ্য ফকিহ/আলেমের শরয়ি পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দাম্পত্য জীবন হলো জান্নাতের পথে একসঙ্গে হেঁটে চলার একটি পবিত্র সফর। একে অপরের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার মাধ্যমে একটি সুন্দর ও আনন্দময় ইসলামিক পরিবার গড়ে তোলা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল পরিবারে পারস্পরিক ভালোবাসা, রহমত ও স্থায়ী শান্তি দান করুন। আমীন।
বিঃদ্রঃ এটি সাধারণ শিক্ষামূলক আলোচনা, ফতোয়া নয়। নির্দিষ্ট মাসআলা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
কভার ছবি: Kevin Olson / Unsplash
