আমাদের সৌরমণ্ডলের এক সময়ের নবম গ্রহ 'প্লুটো' দীর্ঘ দিন ধরেই বিজ্ঞানপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। গ্রহ হিসেবে এর শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন এবং নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের কারণে প্রায়শই এই বরফময় ছোট জগতটি নিয়ে ইন্টারনেটে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
প্লুটো কী এবং কেন এটি রহস্যময়?
১৯৩০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবো প্রথম প্লুটো আবিষ্কার করেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এটিকে আমাদের সৌরজগতের নবম গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হতো। সূর্য থেকে অত্যন্ত দূরে অবস্থিত হওয়ায় এই বামন গ্রহটি সম্পর্কে মানুষের জানা-শোনার পরিধি এতদিন বেশ সীমিত ছিল। তবে আধুনিক টেলিস্কোপ এবং বিভিন্ন স্থান-অভিযানের পর প্লুটো সম্পর্কে অনেক চমকপ্রদ তথ্য সামনে এসেছে।
প্লুটোর বায়ুমণ্ডল মূলত নাইট্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে তৈরি। অত্যন্ত ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে এখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে অবস্থান করে। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে এই গ্রহটির প্রায় ২৪৮ বছর সময় লাগে, যা এর কক্ষপথের দীর্ঘতার একটি অন্যতম প্রমাণ।
প্লুটো কেন গ্রহের তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল?
২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন (IAU) গ্রহের সংজ্ঞা নির্ধারণে কিছু নতুন নিয়ম চালু করে। একটি মহাজাগতিক বস্তুকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে বিবেচিত হতে হলে প্রধানত তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
- বস্তুটিকে অবশ্যই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসতে হবে।
- এর পর্যাপ্ত ভর থাকতে হবে যাতে নিজের অভিকর্ষ বলের কারণে একটি গোলাকার আকৃতি ধারণ করতে পারে।
- এর কক্ষপথের আশপাশের এলাকা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু থেকে পরিষ্কার বা মুক্ত থাকতে হবে।
প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত পূরণ করলেও তৃতীয় শর্তটি পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। কারণ প্লুটোর কক্ষপথ কাইপার বেল্ট অঞ্চলের অন্যান্য ছোট ছোট বরফময় বস্তুর সাথে শেয়ার করা। ফলে ২০০৬ সালে প্লুটোকে 'বামন গ্রহ' (Dwarf Planet) হিসেবে নতুন শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।
নতুন গবেষণা এবং বিতর্ক
প্লুটোকে বামন গ্রহ হিসেবে ঘোষণা করার পর বৈজ্ঞানিক সমাজে বড় ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বহু জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মহাকাশ গবেষক এখনও মনে করেন যে গ্রহের এই সংজ্ঞাটি কিছুটা সীমাবদ্ধ। বিশেষ করে ২০১৫ সালে নাসার 'নিউ হরাইজন্স' মহাকাশযান যখন প্লুটোর কাছ দিয়ে উড়ে যায়, তখন এর পাঠানো উচ্চমানের ছবি ও উপাত্ত মহাকাশবিজ্ঞানীদের স্তম্ভিত করে দেয়।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, প্লুটোর উপরিভাগে রয়েছে বিশাল বরফের পর্বত, হিমবাহ এবং বায়ুমণ্ডলের হালকা স্তর। একটি নিষ্ক্রিয় পাথরখণ্ডের বদলে প্লুটোকে একটি ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় জগত হিসেবে দেখা যায়। ফলে অনেক গবেষক যুক্তি দিচ্ছেন যে প্লুটোর মতো জটিল ও সক্রিয় জগতকে কেবল বামন গ্রহ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়।
যেসব তথ্য এখনও সুনির্দিষ্ট নয়
প্লুটো নিয়ে বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—যেমন এটি নাকি আবার পূর্ণাঙ্গ গ্রহের মর্যাদা পেয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা (IAU) এখনো এর শ্রেণিবিন্যাসে কোনো পরিবর্তন আনেনি।
এছাড়া প্লুটোর বরফের নিচে ভূগর্ভস্থ কোনো মহাসাগর আছে কি না, কিংবা সেখানে ভবিষ্যতে জীবনের কোনো প্রাথমিক উপাদান পাওয়া সম্ভব কি না—এসব বিষয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে। এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বিজ্ঞানীদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
সাধারণ প্রশ্ন
প্লুটো কি আবার গ্রহের মর্যাদা পেতে পারে?
মহাকাশবিজ্ঞানীদের একাংশ এই দাবি তুলে আসলেও আনুষ্ঠানিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা থেকে এখনো প্লুটোকে পূর্ণাঙ্গ গ্রহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। এই বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তর্ক-বিতর্ক এখনো চলমান।
প্লুটো সূর্য থেকে কত দূরে অবস্থিত?
সূর্য থেকে প্লুটোর গড় দূরত্ব প্রায় ৫৯০ কোটি কিলোমিটার। এই বিশাল দূরত্বের কারণে সেখানে সূর্যালোক পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে এবং এলাকাটি অত্যন্ত শীতল।
প্লুটোর কয়টি উপগ্রহ রয়েছে?
প্লুটোর মোট পাঁচটি জানা উপগ্রহ রয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় উপগ্রহটির নাম 'ক্যারন' (Charon), যা আকারে প্লুটোর প্রায় অর্ধেক।
উপসংহার
সৌরমণ্ডলের দূরবর্তী সীমানায় থাকা প্লুটো আমাদের জন্য একটি বড় বিজ্ঞানের রহস্য। এটি গ্রহ বা বামন গ্রহ যা-ই হোক না কেন, মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমে যায়নি। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানের মাধ্যমে হয়তো এই বরফময় জগত সম্পর্কে আরও অনেক অজানা তথ্য উন্মোচিত হবে।
কভার ছবি: ThisisEngineering / Unsplash
