পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ মেটাতে ইসলাম ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। নিজেদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সৎ নিয়ত, রাগ নিয়ন্ত্রণ এবং আপস-মীমাংসার ইসলামি নির্দেশনা মেনে চললে পরিবারে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
রাগ সংবরণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ
পরিবারে ঝগড়ার মূল সূচনা হয় অনিয়ন্ত্রিত রাগ থেকে। শয়তান মানুষের মন কষাকষি বাড়িয়ে দিয়ে পারিবারিক বন্ধন নষ্ট করতে চায়। তাই ঝগড়ার মুহূর্ত তৈরি হলে ইসলাম রাগ সংবরণ করার জন্য বিশেষ তাগিদ দিয়েছে।
- চুপ থাকা: রাগের মাথায় কোনো কথা বা প্রতিক্রিয়া না দিয়ে সাময়িকভাবে চুপ থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
- অবস্থান পরিবর্তন: দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া এবং বসে থাকলে শুয়ে পড়ার কথা হাদিসে এসেছে।
- ওজু করা: পানি দিয়ে ওজু করলে শরীরের ভেতরের উত্তাপ ও রাগ প্রশমিত হয়।
ক্ষমা ও উদারতার মানসিকতা গড়ে তোলা
মানুষ মাত্রই ভুল করে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে ইসলাম শেখায় অন্যকে ক্ষমা করতে, কারণ আল্লাহ ক্ষমাশীলদের পছন্দ করেন।
পুরোনো ভুল বারবার তুলে এনে খোঁটা না দেওয়া এবং অতীতের ছোটখাটো বিষয় ভুলে গিয়ে নতুন করে ভালোবাসার পরিবেশ তৈরি করা সুখী পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।
নম্র ভাষায় কথা বলা ও ভুল স্বীকার করা
কথা বলার সুর ও শব্দ নির্বাচন পরিবারের সার্বিক মেজাজ ঠিক করে দেয়। কঠোর ও অপমানজনক বাক্য পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মন ভেঙে দেয়। ইসলাম আমাদের সবসময় সুন্দর ও নম্র ভাষায় কথা বলার নির্দেশ দেয়।
- নিজে ভুল করলে দ্বিধাহীনভাবে ক্ষমা চাওয়া এবং আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা।
- অন্যের মতামতকে সম্মান জানানো এবং খাটো করে না দেখা।
- সন্তানদের সামনে বড়দের ঝগড়া না করে নিজেরা আলাদাভাবে কথা বলে সমাধান করা।
পারিবারিক পরামর্শ বা 'শুরা'র চর্চা
ইসলামে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক পরামর্শ বা 'শুরা' করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবারেও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সবাই মিলে শান্ত পরিবেশে খোলামেলা আলোচনার আয়োজন করা যেতে পারে।
যদি পারিবারিক দ্বন্দ্ব জটিল রূপ নেয় এবং নিজেদের মধ্যে সমাধান না হয়, তবে উভয় পক্ষের অভিভাবক বা কোনো সম্মানিত ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির মধ্যস্থতা গ্রহণের পরামর্শ কোরআনে প্রদান করা হয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও চিকিৎসকের পরামর্শ
অনেক সময় অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতার কারণেও মানুষের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং পরিবারে তুচ্ছ কারণে ঝগড়া বেঁধে যায়। এসব ক্ষেত্রে দোয়ার পাশাপাশি নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনবোধে পেশাদার কাউন্সেলর বা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
সাধারণ প্রশ্ন
১. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হলে কার আগে এগিয়ে আসা উচিত?
ইসলামে ভালো কাজে উদ্যোগ নেওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই যিনি আগে ক্ষমা চাইবেন বা বিবাদ মেটাতে এগিয়ে আসবেন, তিনি আল্লাহর কাছে বেশি প্রতিদান পাবেন। এতে কারো সম্মান কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়।
২. বাইরের কারো কথায় পরিবারে অশান্তি হলে কী করণীয়?
যেকোনো কথা শোনার পর তা সত্য কি না তা যাচাই না করে প্রতিক্রিয়া জানানো অনুচিত। পরিবারের সদস্যদের উচিত বাইরের কথায় কান না দিয়ে নিজেদের মধ্যে সরাসরি কথা বলে সত্য জেনে নেওয়া এবং একে অপরের ওপর আস্থা রাখা।
৩. জটিল পারিবারিক সমস্যায় কি আলেমের কাছে যাওয়া যাবে?
হ্যাঁ, যদি নিজেদের চেষ্টা বা অভিভাবকদের সাহায্যে বিবাদ মিটমাট না হয়, তবে শরিয়তের সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে কোনো বিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ফিকহি বা আইনি বিষয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত না নিয়ে অভিজ্ঞ আলেমের শরণাপন্ন হওয়া উত্তম।
উপসংহার
পরিবার হলো পৃথিবীর বুকে এক পরম শান্তির নীড়। ধৈর্য, ভালোবাসা, সুন্দর ব্যবহার এবং পারস্পরিক ত্যাগের মাধ্যমেই একটি পরিবারে স্থায়ী সুখ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি পরিবারকে হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদ থেকে রক্ষা করুন এবং আমৃত্যু ভালোবাসায় আবদ্ধ রাখুন। আমীন।
বিঃদ্রঃ এটি সাধারণ শিক্ষামূলক আলোচনা, ফতোয়া নয়। নির্দিষ্ট মাসআলা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
