প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগ, যা বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রবাসীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি তৈরি থেকে শুরু করে দেশে ও বিদেশে প্রবাসীদের নানা সেবা নিশ্চিত করা এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান দায়িত্ব।
মন্ত্রণালয়ের মূল লক্ষ্য ও কাজের পরিধি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিপুল সংখ্যক অভিবাসী জনগোষ্ঠীর নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং তাদের সার্বিক অধিকার রক্ষা করতেই এই মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।
এর প্রধান কার্যক্রম ও লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি এবং শ্রমবাজার প্রসারিত করা।
- নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা: দালালের প্রতারণা এড়িয়ে বৈধ ও নিরাপদ উপায়ে অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সচেতনতা সৃষ্টি করা।
- দক্ষতা উন্নয়ন: আন্তর্জাতিক চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশি কর্মীদের পেশাগত দক্ষতা ও ভাষা শেখার ব্যবস্থা করা।
- প্রবাসীদের অধিকার রক্ষা: বিদেশে অবস্থানরত কর্মীদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা, বেতন এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার রক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ।
প্রধান অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ও তাদের ভূমিকা
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকটি অধীনস্থ দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সেবা দিয়ে থাকে। প্রধান অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো হলো:
- জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET): বিদেশগামী কর্মীদের নিবন্ধন, স্মার্ট কার্ড প্রদান এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে।
- ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: প্রবাসীদের কল্যাণমূলক সেবা, অসুস্থ বা বিপদে পড়া কর্মীদের সাহায্য, মৃতদেহ পরিবহন এবং সন্তানদের শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করে।
- প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক: বিদেশে যাওয়ার খরচ মেটাতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এবং বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনে সাহায্য করে।
- বোয়েসেল (BOESL): এটি একটি সরকারি জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান, যা নামমাত্র খরচে সরকারিভাবে লোক পাঠায়।
নিরাপদ অভিবাসন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ কর্মীর বিকল্প নেই। সে লক্ষ্যেই এই মন্ত্রণালয় সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর (TTC) মাধ্যমে বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ইলেকট্রিক্যাল, ড্রাইভিং, ওয়েল্ডিং, নির্মাণকাজ এবং ভাষার দক্ষতার ওপর নিয়মিত কোর্স করানো হয়।
তাছাড়া বিদেশ গমনের পূর্বে বাধ্যতামূলক প্রাক-বহির্গমন ওরিয়েন্টেশন দেওয়া হয়, যা কর্মীদের গন্তব্য দেশের আইন, সংস্কৃতি এবং সুরক্ষার বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করতে সাহায্য করে।
প্রবাসী ও তাদের পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা
বিদেশে অবস্থানকালে কোনো প্রবাসী সমস্যায় পড়লে বা দেশে ফেরার পর তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রবাসী পরিবারের সন্তানদের মেধা বিকাশে বৃত্তি প্রদান করা হয়। কোনো কর্মী বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবারকে আর্থিক অনুদান ও বীমা সুবিধার মাধ্যমে পাশে দাঁড়ায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড।
সাধারণ প্রশ্ন
১. বিএমইটি স্মার্ট কার্ড কেন জরুরি?
বিএমইটি স্মার্ট কার্ড হলো বৈধ উপায়ে বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সরকারি সনদ। এই কার্ড ছাড়া বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন অতিক্রম করা সম্ভব নয় এবং এটি বিদেশের মাটিতে কর্মীর নিবন্ধিত সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।
২. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে কীভাবে ঋণ নেওয়া যায়?
বৈধ ভিসা এবং বিদেশ গমনের প্রামাণ্য কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে সুনির্দিষ্ট শর্তে অভিবাসন ঋণ নেওয়া যায়। একইভাবে বিদেশ থেকে ফিরে এসে ব্যবসা শুরু করার জন্য পুনর্বাসন ঋণও সহজ শর্তে পাওয়া যায়।
৩. বিদেশে কোনো প্রবাসী সমস্যায় পড়লে কী করবেন?
গন্তব্য দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া প্রয়োজনে সরাসরি ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বা মন্ত্রণালয়ের হটলাইনে যোগাযোগ করে আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সঠিক নিয়ম মেনে বৈধ উপায়ে বিদেশে গেলে একদিকে যেমন নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতেও গতি সঞ্চারিত হয়।
কভার ছবি: Apex Virtual Education / Unsplash
