আমাদের শরীরে লাল রক্তকণিকা ও হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য আয়রন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। রক্তে আয়রনের ঘাটতি হলে শরীরের কোষগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
আয়রনের অভাব হলে শরীরে যেসব লক্ষণ দেখা দেয়
শরীরে আয়রনের ঘাটতি তৈরি হলে কিছু সাধারণ শারীরিক উপসর্গ ফুটে ওঠে। শুরুতে এগুলো মৃদু হতে পারে, তবে সময়মতো খেয়াল না করলে ঘাটতি বাড়ার সাথে সাথে লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণত যে উপসর্গগুলো দেখা যায়:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা ঘুমানোর পরও সার্বক্ষণিক ক্লান্ত লাগা এবং শরীর অবসাদগ্রস্ত মনে হওয়া।
- ত্বক ও চোখের ফ্যাকাশে ভাব: চোখের ভেতরের পাতার অংশ, মাড়ি, নখ কিংবা ত্বক স্বাভাবিক গোলাপির বদলে ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে।
- অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট: সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা বা সামান্য হাঁটাচলাতেই ঘন ঘন হাঁপিয়ে ওঠা বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।
- মাথা ঘোরা ও মাথা ব্যথা: মস্তিষ্কে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে গেলে প্রায়ই মাথা ঝিমঝিম করতে পারে বা হালকা ব্যথা হতে পারে।
- হাত ও পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া: সঠিক রক্ত সঞ্চালনের অভাবে স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও হাত-পা অতিরিক্ত ঠান্ডা অনুভূত হতে পারে।
- নখ ভঙ্গুর হওয়া ও চুল পড়া: নখ সহজে ভেঙে যাওয়া, চামচের মতো বাঁকা হয়ে যাওয়া এবং চুল অতিরিক্ত হারে ঝরে পড়া।
- অস্বাভাবিক কিছুর প্রতি আকর্ষণ: কিছু ক্ষেত্রে বরফ, মাটি, চুন বা কাঁচা চাল খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'পাইকা' বলা হয়।
যাদের ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন
সব মানুষের ক্ষেত্রে আয়রনের চাহিদা সমান নয়। নির্দিষ্ট কিছু শারীরিক অবস্থা বা বয়সের ওপর ভিত্তি করে আয়রনের অভাব হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে:
- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা: গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি ও নিজের অতিরিক্ত রক্তের চাহিদা মেটাতে এই সময়ে আয়রনের প্রয়োজন অনেক বেড়ে যায়।
- শিশু ও কিশোর-কিশোরী: দ্রুত শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সময় শিশুদের খাদ্যে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকলে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
- অতিরিক্ত রক্তস্রাব হওয়া নারী: যাদের মাসিকে অতিরিক্ত রক্তপাত হয়, তাদের শরীরে রক্তের ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
- দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি: কিডনি সমস্যা, পাকস্থলীর আলসার বা পরিপাকতন্ত্রের কোনো দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধি থাকলে আয়রন শোষণে সমস্যা হতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা: শরীরে আয়রনের ঘাটতি মনে হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দোকান থেকে আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা উপাদান কিনে খাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয়রন জমলে তা লিভার বা হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি পূরণের উপায় ও কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে পরিমিত পরিবর্তন এনে আয়রনের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখা সম্ভব। খাদ্যতালিকায় যেসব খাবার রাখা যেতে পারে:
- উদ্ভিজ্জ উৎস: পালং শাক, কচু শাক, লাল শাক, সব ধরনের ডাল, শিমের বিচি, কিসমিস ও খেজুর।
- প্রাণিজ উৎস: কলিজা, লাল মাংস (গরু বা খাসির মাংস পরিমিত মাত্রায়), মুরগির মাংস, ডিমের কুসুম ও বিভিন্ন প্রকার মাছ।
- ভিটামিন সি যুক্ত খাবার: আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের সাথে ভিটামিন সি (যেমন লেবু, আমলকী, কমলা) খেলে তা শরীরকে দ্রুত আয়রন শোষণে সাহায্য করে।
খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কিছু জানা তথ্য:
- খাবার খাওয়ার পরপরই চা বা কফি পান করলে এর ট্যানিন ও ক্যাফেইন আয়রন শোষণে বাধা দেয়। তাই খাবার খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা পর চা-কফি পান করা ভালো।
- শুধু নিরামিষ খাবার খেলে অনেক সময় আয়রনের সঠিক শোষণ ধীরগতিতে হতে পারে, তাই শাকসবজির সাথে লেবুর রস বা ভিটামিন সি যুক্ত খাবার মিশিয়ে খাওয়া উপকারী।
সাধারণ প্রশ্ন
খাবারের মাধ্যমে ঘাটতি না মেটলে কী করণীয়?
যদি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের পরও ফ্যাকাশে ভাব বা ক্লান্তি না কমে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শে সিবিসি (CBC) বা সিরাম ফেরিটিন পরীক্ষা করে সঠিক মাত্রায় ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
আয়রন ট্যাবলেট খেলে কি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে?
কিছু ক্ষেত্রে আয়রন ট্যাবলেট খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি ভাব, পেট মোচড়ানো বা পায়খানার রং কালো হতে পারে। তাই এটি চিকিৎসকের নির্দেশিত নিয়ম মেনে খাওয়া ভালো।
সব ধরনের রক্তস্বল্পতাই কি আয়রনের অভাবে হয়?
না, ভিটামিন বি১২ বা ফোলিক অ্যাসিডের অভাব এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো জিনগত কারণেও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। তাই উপযুক্ত রক্ত পরীক্ষা ছাড়া কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
শরীরে সুস্বাস্থ্য ও শক্তি বজায় রাখতে আয়রনের ভূমিকা অপরিসীম। তবে আপনার বা পরিবারের কারো যদি টানা ক্লান্তি, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা ফ্যাকাশে ভাব দেখা দেয়, তবে কোনো ঘরোয়া টোটকার ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে দ্রুত একজন নিবন্ধিত ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
কভার ছবি: Jason Briscoe / Unsplash
