তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি হলো মূলত মাটির নিচ থেকে উত্তোলিত প্রাকৃতিক গ্যাসকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তরিত রূপ। গ্যাসীয় অবস্থার তুলনায় তরল অবস্থায় এর আয়তন প্রায় ছয়শো গুণ কমে যায়, ফলে দূর-দূরান্তে অত্যন্ত নিরাপদে ও কার্যকরভাবে এটি পরিবহন করা সম্ভব হয়।
এলএনজি কী এবং এটি কীভাবে প্রস্তুত করা হয়?
সাধারণ প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান হলো মিথেন। যখন এই প্রাকৃতিক গ্যাসকে খনি থেকে উত্তোলন করা হয়, তখন এতে জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার এবং অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় উপাদান মিশে থাকে। এলএনজি তৈরি করার জন্য প্রসেসিং প্ল্যান্টে প্রথমে এসব উপাদান দূর করে গ্যাসকে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ করা হয়।
বিশুদ্ধকরণের পর এই গ্যাসকে প্রায় মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (মাইনাস ২৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) তাপমাত্রায় ঠান্ডা করা হয়। এই তীব্র হিমায়িত প্রক্রিয়ায় গ্যাস তার বায়বীয় রূপ হারিয়ে স্বচ্ছ ও বর্ণহীন তরলে পরিণত হয়। তরলীকৃত হওয়ার কারণে বড় বড় ট্যাংকার জাহাজে করে সমুদ্রে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাঠানো সহজ হয়, যেখানে সাধারণ পাইপলাইন স্থাপন করা অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এলএনজি পরিবহন ও পুনঃগ্যাসীকরণ প্রক্রিয়া
এলএনজি তৈরি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রযুক্তিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে মূলত তিনটি প্রধান ধাপে ভাগ করা যায়:
- তরলীকরণ (Liquefaction): বিশেষ প্ল্যান্টে প্রাকৃতিক গ্যাসকে পরিশোধিত করে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তর করা হয়।
- বিশেষ জাহাজে পরিবহন (Shipping): থার্মোফ্লাস্কের মতো বিশেষ ইনসুলেটেড ট্যাংকার জাহাজে (এলএনজি ক্যারিয়ার) করে সমুদ্রপথে এই তরল গ্যাস পরিবাহিত হয়।
- পুনঃগ্যাসীকরণ (Regasification): গন্তব্যের টার্মিনালে পৌঁছানোর পর এলএনজির তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে তা আবার সাধারণ বায়বীয় গ্যাসে রূপান্তর করা হয় এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণত ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (Floating Storage and Regasification Unit) এবং স্থলভিত্তিক টার্মিনালের মাধ্যমে এই পুনঃগ্যাসীকরণের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
এলএনজি ব্যবহারের সুবিধা ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে এলএনজির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধির পেছনে কিছু সুস্পষ্ট সুবিধা রয়েছে, তবে এর সাথে কিছু বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জও জড়িয়ে রয়েছে।
প্রধান সুবিধাসমূহ:
- সহজ পরিবহনযোগ্যতা: যেসব অঞ্চলে মহাদেশীয় পাইপলাইন সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে জাহাজের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পৌঁছানো সম্ভব।
- পরিবেশগত দিক: কয়লা বা খনিজ তেলের তুলনায় প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ালে বাতাসে অনেক কম ক্ষতিকর কার্বন নির্গত হয়।
- জ্বালানি নিরাপত্তা: যেসব দেশের নিজস্ব গ্যাস সম্পদ সীমিত, তারা আমদানির মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে পারে।
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ:
- উচ্চ অবকাঠামোগত ব্যয়: এলএনজি প্ল্যান্ট, বিশেষায়িত জাহাজ এবং পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিশাল অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
- আন্তর্জাতিক বাজারের দামের অস্থিরতা: বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক চাহিদার ওপর নির্ভর করে বিশ্ববাজারে এলএনজির দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা যায়।
- প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা: অতি নিম্ন তাপমাত্রায় তরল গ্যাস ধরে রাখা এবং রূপান্তর করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়, যা উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা দাবি করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে এলএনজির ভূমিকা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা সচল রাখা এবং সার কারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক নিয়মে হ্রাস পাওয়ায় চাহিদা ও জোগানের মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক তৈরি হয়েছে। এই সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানির ওপর আংশিক নির্ভর করছে।
জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার ফলে শিল্প খাতের চাকা সচল রাখা সহজ হলেও, বিশ্ববাজারে এর মূল্যের অস্থিরতা অনেক সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি সৌর ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানোর ওপর জোর দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
সাধারণ প্রশ্ন
এলএনজি এবং সিএনজির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
এলএনজি হলো অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে তরলে রূপান্তরিত গ্যাস, যা মূলত বড় জাহাজে করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে সিএনজি (Compressed Natural Gas) হলো সাধারণ তাপমাত্রাতেই উচ্চ চাপ প্রয়োগ করে আয়তন কমানো গ্যাস, যা মূলত মোটরযানে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এলএনজি কি সরাসরি দাহ্য বা অত্যন্ত বিপজ্জনক?
তরল অবস্থায় এলএনজি সরাসরি জ্বলে ওঠে না বা বিস্ফোরণ ঘটায় না। তবে এটি যখন বাতাসে উন্মুক্ত হয়ে পুনরায় সাধারণ গ্যাসে পরিণত হয়, তখন উপযুক্ত ঘনমাত্রায় বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে তা দাহ্য হয়ে ওঠে। এজন্য এর পরিবহনে বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এলএনজি কীভাবে পুনরায় সাধারণ গ্যাসে পরিণত করা হয়?
আমদানিকৃত এলএনজিকে টার্মিনালে এনে বিশেষ হিট এক্সচেঞ্জারের মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়। সেখানে উষ্ণ পানি বা অন্য কোনো তাপ উৎস ব্যবহার করে এর তাপমাত্রা বাড়ানো হয়, যার ফলে এটি পুনরায় স্বাভাবিক বায়বীয় গ্যাসে রূপান্তরিত হয়ে পাইপলাইনে প্রবেশের উপযোগী হয়।
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবর্তনের এই যুগে বিদ্যুৎ ও শিল্পের নিরবচ্ছিন্ন চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে রক্ষা পেতে আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান এবং টেকসই জ্বালানি কৌশলের সফল বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
কভার ছবি: Shah Sahab / Unsplash
