কৈশোরের পরিবর্তনের সময়ে সন্তানকে কঠোর শাসনে রাখার চেয়ে স্নেহের মাধ্যমে তার কাছাকাছি আসা এবং ধৈর্য ধরে তার কথা শোনাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। সহনশীল আচরণ, তাদের অনুভূতির মূল্যায়ন এবং সুন্দর ইসলামিক আদর্শের চর্চার মাধ্যমে এই বয়সে সন্তানের সঙ্গে একটি মজবুত ও শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়।
কৈশোরের পরিবর্তনকে সহানুভূতির সঙ্গে অনুধাবন করা
কৈশোর এমন একটি সময় যখন একটি শিশুর শরীরে ও মনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। এই বয়সে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়তে চায় এবং মানসিকভাবে কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। অভিভাবক হিসেবে এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সন্তান কেন হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেল বা কেন আগের চেয়ে আলাদা আচরণ করছে, তা রাগ না করে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
ইসলামে সন্তানের সঙ্গে ভালোবাসা ও দয়ার আচরণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছোট ও তরুণদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। সন্তান যখন বুঝতে পারবে যে তার পিতা-মাতা তাকে বুঝতে পারছেন, তখন তার ভেতরের দ্বিধা ও দূরত্ব অনেকটাই কমে আসবে।
খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি করা
সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার প্রধান শর্ত হলো যোগাযোগের পথ খোলা রাখা। অনেক সময় সন্তান মনে করে যে তার মনের কথা অভিভাবককে বললে তিনি হয়তো রাগ করবেন বা শাস্তি দেবেন। এই ভয় দূর করা মা-বাবার দায়িত্ব।
- মনোযোগ দিয়ে কথা শুনুন: সন্তান যখন কোনো কথা বলতে আসে, তখন নিজের কাজ থামিয়ে তার কথা শুনুন।
- সরাসরি বিচারক হবেন না: সন্তান কোনো ভুলের কথা স্বীকার করলে শুরুতেই বকা না দিয়ে তার সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করুন।
- প্রতিদিনের ছোটখাটো অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন: নিজের সারাদিনের ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নিলে সে-ও নিজের কথা বলতে উৎসাহিত হবে।
কঠোর শাসনের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন
কৈশোরে অতিরিক্ত কড়া শাসন অনেক সময় বিপরীত ফল আনে। এতে সন্তান জেদি হয়ে উঠতে পারে অথবা মা-বাবার কাছ থেকে বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখতে শুরু করে। এ বয়সে সন্তানকে শুধুই আদেশ দেওয়ার বদলে তাকে সিদ্ধান্তের কারণ বুঝিয়ে বলা দরকার।
সন্তানের ভুলত্রুটিতে সবার সামনে লজ্জিত না করে একান্তে ডেকে পরামর্শ দেওয়া এবং সুন্দর ভাষায় বুঝিয়ে বলা কার্যকর ইসলামিক শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদের সঙ্গে সন্তানের তুলনা করা থেকে বিরত থাকা উচিত। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মেধা ও ব্যক্তিত্ব রয়েছে। সন্তানকে তার নিজের গুণাবলীর জন্য প্রশংসা করলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং অভিভাবকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গভীর হয়।
পরিবারে দ্বীনি পরিবেশ ও যৌথ সময় কাটানো
সন্তানকে ভালো কাজের উপদেশ দেওয়ার পাশাপাশি নিজেরা তা অনুশীলন করা সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী। পরিবারে যদি পারস্পরিক স্নেহ ও দ্বীনি আবহ বজায় থাকে, তবে সন্তান সহজেই সেই মূল্যবোধগুলো গ্রহণ করে।
- একসাথে সালাত আদায় করা: সম্ভব হলে ঘরের সবাই একসাথে জামাতে সালাত আদায়ের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
- একত্রে আহার করা: অন্তত দিনের একটি বেলা সবাই একসাথে বসে খাবার গ্রহণ করুন এবং সুন্দর বিষয়ে আলোচনা করুন।
- কুরআন ও হাদিসের শিক্ষণীয় গল্প আলোচনা: সাহাবিদের ও নবীগণের জীবনের ধৈর্য ও চরিত্রের গল্পগুলো সন্তানের সামনে তুলে ধরুন।
ভুলের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সংশোধনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি
কৈশোরে নানাবিধ ভুলের সম্ভাবনা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবকের ধৈর্য ধারণ করা আবশ্যক। তাৎক্ষণিক রাগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি সমাধান করতে হবে। ইসলাম আমাদের শেখায় যে, সংশোধন যেন হয় সংশোধনের উদ্দেশ্যে, অপমান করার জন্য নয়।
সন্তান যদি কোনো ভুল করেই ফেলে, তাকে অনুশোচনার সুযোগ দিন এবং নিশ্চিত করুন যে অভিভাবক হিসেবে আপনি সর্বদা তার পাশে আছেন। তবে কোনো বিষয়ে সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য বা আচরণের জটিলতা অতিরিক্ত মনে হলে দ্বীনি নসিহতের পাশাপাশি পেশাদার কাউন্সিলর বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সমীচীন।
সাধারণ প্রশ্ন
কিশোর সন্তান যদি কথা শুনতে না চায় বা জেদ করে তবে করণীয় কী?
সন্তান জেদ করলে তাৎক্ষণিক তর্ক বা কঠোর আচরণ না করে সময় দিন। পরিস্থিতি শান্ত হলে তাকে স্নেহের সঙ্গে বুঝিয়ে বলুন এবং তার দাবির পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ আছে কিনা তা নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করুন।
সন্তানকে কীভাবে নিয়মিত নামাজের প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়?
জোরজবরদস্তি না করে ভালোবাসার সাথে স্মরণ করিয়ে দিন। নিজেরা নিয়মিত নামাজ আদায় করে তার সামনে আদর্শ স্থাপন করুন এবং নামাজের মাধ্যমে অন্তরে যে প্রশান্তি আসে তা তুলে ধরুন।
সন্তানের ভুল সঙ্গ এড়াতে অভিভাবক হিসেবে কী ভূমিকা রাখা যায়?
সন্তানের বন্ধুদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখুন এবং তাদের পরিবারকেও জানার চেষ্টা করুন। সন্তানকে ঘরে সুন্দর ও মুক্ত পরিবেশ দিন যেন সে বাইরের অনৈতিক সঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট না হয়।
উপসংহার
কিশোর সন্তানকে মানুষ করে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদী ও দায়িত্বশীল কাজ। ভালোবাসা, সহনশীলতা, সঠিক পরামর্শ এবং দোয়া—এই উপাদানগুলোর সমন্বয়েই একটি সুন্দর পারিবারিক বন্ধন গড়ে ওঠে। সন্তানের জন্য নিয়মিত আল্লাহর দরবারে হেদায়েত ও কল্যাণ কামনা করা অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের পরিবারগুলোতে ভালোবাসা, শান্তি ও দ্বীনি হেদায়েত দান করুন। আমিন।
বিঃদ্রঃ এটি সাধারণ শিক্ষামূলক আলোচনা, ফতোয়া নয়। নির্দিষ্ট মাসআলা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
কভার ছবি: Erika Giraud / Unsplash
