সন্তানকে সৎ ও বিনয়ী করে গড়ে তুলতে হলে প্রথমত বাবা-মাকে নিজেদের আচরণে সততা ও নম্রতার চমৎকার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি ভালোবাসাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে নেক সোহবত, নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহর অনুশীলন এবং নিয়মিত দোয়ার মাধ্যমে সন্তানের মনে নৈতিক মূল্যবোধ বুনে দিতে হবে।
১. নিজেদের আচরণকে উত্তম আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলা
শিশুরা উপদেশের চেয়ে দেখে দেখে বেশি শেখে। বাবা-মা যদি নিজেরা সত্যবাদী ও বিনয়ী হন, তবে সন্তান স্বাভাবিকভাবেই সেই গুণগুলো অর্জন করে। ঘরে বা বাইরে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেরা সত্য কথা বলা এবং অন্যদের সাথে নম্র আচরণ করা সন্তানকে নৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে।
- নিজেরা মিথ্যা পরিহার করা: এমনকি কৌতুক বা মজার ছলেও সন্তানের সামনে মিথ্যা কথা না বলা।
- আচরণে বিনয় রক্ষা: বাসার গৃহকর্মী, যানবাহন চালক বা ছোট-বড় সবার সাথে নম্র ও শ্রদ্ধাপূর্ণ ভাষায় কথা বলা।
- ভুল স্বীকার করা: নিজেদের কোনো ভুল হলে তা সহজভাবে মেনে নেওয়া, যাতে সন্তানও ভুল স্বীকার করার সাহস পায়।
২. সততার চর্চা ও সত্য বলার পরিবেশ তৈরি করা
ইসলামে সততাকে পরম সদ্ব্যবহার ও ঈমানের সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই বোঝাতে হবে যে, পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, সত্য বলার মধ্যেই শান্তি ও আল্লাহর সুসংবাদ নিহিত রয়েছে।
সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হাদিসে সত্যবাদিতাকে কল্যাণ ও জান্নাতের পথ হিসেবে আলোকপাত করা হয়েছে। সন্তান যখন কোনো ভুল করে ফেলে, তখন অতিরিক্ত কড়া শাস্তি না দিয়ে তাকে সত্য বলার জন্য উৎসাহিত করা উচিত। এতে সে ভয়ের কারণে মিথ্যা বলার অভ্যাস গড়ে তুলবে না।
৩. বিনয় ও নম্রতার ইসলামি শিক্ষা
অহংকার থেকে দূরে রেখে সন্তানকে বিনয়ী করার শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি অভিভাবকের মূল দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনে সুরা লুকমানে হজরত লুকমান (আ.) তাঁর সন্তানকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, তা প্রতিটি পরিবারের জন্য চিরন্তন আদর্শ।
- নম্রভাবে চলাফেরা করা: মাটিতে অহংকার নিয়ে না হেঁটে স্বাভাবিক ও শান্ত ভঙ্গিতে চলাফেরা করতে শেখানো।
- কণ্ঠস্বর নিচু রাখা: অপ্রয়োজনে চিৎকার বা হুকুম না করে মার্জিত ও নিচু স্বরে কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলা।
- অন্যের প্রতি সম্মান: কারও রূপ, বংশ বা আর্থিক অবস্থা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ না করার শিক্ষা দেওয়া।
৪. সৎ সঙ্গ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা
সন্তানের চরিত্র গঠনে তার সঙ্গীদের ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। ভালো সঙ্গ মানুষকে ভালো পথের দিকে টানে, আর অসৎ সঙ্গ নৈতিক মূল্যবোধ নষ্ট করে।
পারিবারিকভাবে সন্তানকে ভালো ও চরিত্রবান বন্ধুদের সাথে মেলামেশার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। এছাড়া ঘরের পরিবেশ এমন হওয়া উচিত যেখানে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দ্বীনি আলোচনা হয়। ইন্টারনেট ও বিভিন্ন ডিভাইসের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার থেকে সন্তানকে সুরক্ষায় স্নেহময় নজরদারি রাখা প্রয়োজন।
৫. ভালোবাসা ও শাসনের ভারসাম্য রক্ষা
সন্তানকে সুন্দর মানসিকতায় গড়ে তোলার জন্য ভালোবাসা ও শাসনের সঠিক ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত কঠোরতা সন্তানকে একগুঁয়ে বা মিথ্যাবাদী করে তুলতে পারে, আবার অতিরিক্ত শিথিলতা তাকে অনিয়ন্ত্রিত করে ফেলে।
- প্রশংসা ও উৎসাহ: সন্তান ভালো কাজ বা সততার পরিচয় দিলে মুক্তকণ্ঠে তার প্রশংসা করা।
- ধৈর্যশীল শাসন: সন্তান ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে রাগান্বিত না হয়ে একান্তে ডেকে বুঝিয়ে বলা।
- পারিবারিক সময়: প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় সন্তানের সাথে গল্প করা ও তার মনের কথা শোনার মানসিকতা রাখা।
৬. সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা
সন্তানের সুশিক্ষা ও দ্বীনদারির জন্য আল্লাহর দরবারে অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া করা বাবা-মার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। কুরআন মাজিদে মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে সন্তান ও পরিবারের জন্য বিশেষ দোয়ার কথা বলা হয়েছে।
কুরআনে একটি সুপরিচিত দোয়ায় বলা হয়েছে, "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখ জুড়ানো উপহার বানিয়ে দাও এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানাও।" (সুরা ফুরকান)
সাধারণ প্রশ্ন
সন্তান ভুল করলে বা মিথ্যা বললে কীভাবে সংশোধন করব?
সন্তান মিথ্যা বললে প্রকাশ্যে বা অন্যদের সামনে চিৎকার না করে আলাদাভাবে ডেকে শান্তভাবে কথা বলুন। তাকে বোঝান যে সত্য বললে আল্লাহ খুশি হন। সে সত্য স্বীকার করলে তাকে ধমক না দিয়ে সত্য বলার সাহসকে সাধুবাদ জানান এবং ভুলের সংশোধনে সাহায্য করুন।
সন্তানকে কীভাবে অহংকার থেকে দূরে রাখা যায়?
সন্তানকে সাধারণ ও মেহনতি মানুষের সাথে মেশার সুযোগ দিন এবং মানুষকে চরিত্র ও ঈমান দিয়ে ভালোবাসতে শেখান। কোনো অভাবী মানুষকে দান বা সাহায্য করার সময় সন্তানের হাত দিয়ে দেওয়ানোর অভ্যাস করলে তার মনের অহংকার দূর হয়।
সন্তান যদি খুব বেশি জেদি বা একগুঁয়ে হয়, তবে করণীয় কী?
সন্তানের অতিরিক্ত জেদের পেছনে কোনো শারীরিক বা মানসিক কারণ আছে কি না তা খেয়াল করুন। তার সাথে অতিরিক্ত জবরদস্তি না করে তার কথা শুনুন এবং যুক্তি দিয়ে বোঝান। প্রয়োজনে কোনো অভিজ্ঞ শিশু পরামর্শক বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রতিদিন সন্তানের জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন।
উপসংহার
সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া পরম আমানত। পারিবারিক জীবনের সুশিক্ষা, সৎ চর্চা এবং পিতা-মাতার অপরিসীম ধৈর্য ও ভালোবাসার মাধ্যমেই একটি শিশু ভবিষ্যতে সৎ ও বিনয়ী নাগরিক হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকল সন্তানকে মা-বাবার চোখ জুড়ানো ও নেক মানুষ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
বিঃদ্রঃ এটি সাধারণ শিক্ষামূলক আলোচনা, ফতোয়া নয়। নির্দিষ্ট মাসআলা বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।
কভার ছবি: Jochen van Wylick / Unsplash
